স্বাদ – যা বলা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়! এ এক অনুভূতি – যা অন্তরাত্মার খোরাক যোগায়, অজান্তেই মনে প্রশান্তির ঢেকুর তোলে, আর বহুদিনের পুরোনো স্মৃতিকে নিঃশব্দে জাগিয়ে দেয়। যে অনুভূতি মন ছুঁয়ে যায় – সেটাই আসল স্বাদ।
সময় বদলেছে। উন্নয়নের তাগিদে আমরা প্রতিদিন আধুনিক বিজ্ঞানের শরণাপন্ন হচ্ছি। জীবন হয়েছে দ্রুত, আরামদায়ক কিন্তু সেই সঙ্গে যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের আসল স্বাদ। আজকের মানুষ প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অভ্যস্ত, অথচ মনের গভীরে কোথাও পুরোনো দিনের স্বাদকে খুঁজে ফেরে। টাকা আছে, সামর্থ্য আছে – তবু পছন্দের সেই আসল জিনিসটি খুঁজে পাওয়া যায় না।
ঠিক এই জায়গা থেকেই আমাদের গল্পের শুরু।
শীত এলেই শহর-গ্রাম নির্বিশেষে মানুষের মনে এক বিশেষ অনুভূতির জাগরণ ঘটে। খেজুরের গুড়ের পিঠা, পায়েস, পুলি – এই নামগুলোই যেন শীতের সকালে আলাদা এক উষ্ণতা এনে দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজ বাজারে যে খেজুরের গুড় পাওয়া যায়, তার কতটুকুই বা খাঁটি?
খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হওয়ার কথা যে গুড়ের, বাজারে প্রচলিত অধিকাংশ “খেজুরের গুড়” আদতে চিনি ও নানা ধরনের রাসায়নিকের মিশ্রণ। কোথাও চিনি, চুন, কাপড়ের রং, আটা এমনকি হাইড্রোজেন জাতীয় ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে তা গুড়ের মতো রূপ দেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতি পাঁচ লিটার খেজুরের রসে ৫০ কেজি চিনি মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে তথাকথিত গুড়। আবার এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ঝোলা গুড় কিনে তাতে রং ও চিনি মিশিয়ে নতুন করে গুড় বানাচ্ছেন – যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
আমরা দাম দিচ্ছি, কিন্তু জানি না – এই গুড় আদৌ কোনো পুষ্টিগুণযুক্ত কি না! পরিবারকে খাওয়াচ্ছি, অথচ ভাবছি না – এটা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ভেজালের ভিড়ে খাঁটি স্বাদের সন্ধানেই আমাদের পথচলা। কথায় আছে—
“বৃক্ষ তোমার নাম কী? নাম নয়, ফলে পরিচয়।”
আমরাও নাম দিয়ে নয়, স্বাদ, গন্ধ আর অনুভূতি দিয়ে আমাদের পরিচয় দিতে চাই। এই ভাবনা থেকেই আমাদের উদ্যোগের জন্ম।
শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে কাজ শুরু করি। দক্ষ ও অভিজ্ঞ গাছিদের মাধ্যমে খেজুর গাছ প্রস্তুত করা হয়, যেন গাছের কোনো ক্ষতি না করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে রস সংগ্রহ করা যায়। খেজুরের রস সংগ্রহ একটি সময়সাপেক্ষ এবং দক্ষতানির্ভর প্রক্রিয়া। প্রথমে বয়স্ক ও সুস্থ খেজুর গাছ নির্বাচন করা হয় এবং গাছের মাথার অংশ পরিষ্কার করা হয়। এরপর ধারালো দা দিয়ে গাছের সাদা অংশ সাবধানে কেটে সেখানে নল বসানো হয়, যাতে রস নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। নলের নিচে মাটির কলসি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে সারারাত রস জমা হয় এবং শীতের সকালে গাছিরা কলসি নামিয়ে তাজা রস সংগ্রহ করেন। এই তাজা রস জ্বাল করেই ধীরে ধীরে তৈরী হয় গুড়। এরপর তা বিভিন্ন ফর্মায় ফেলে গুড়ের বিভিন্ন আকৃতি দেয়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীত মৌসুমে সম্পন্ন করা হয়।
বর্তমানে আমরা প্রতিদিন প্রায় ৮৫টি খেজুর গাছ থেকে আনুমানিক ৩৬০ লিটার রস সংগ্রহ করছি। এই রস থেকে তৈরি হয় — পাটালি গুড়, দানাদার/রোয়া গুড়, রাব / লিকুইড দানা ছাড়া গুড় (ঝোলা গুড়) এবং চকলেট / বীজ গুড়। এ থেকে মোট প্রায় ৩০–৩৫ কেজি গুড় তৈরী হয়।
গুড় তৈরির সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য পার্থক্য রয়েছে। রস জ্বালানোর সময় ও তাপমাত্রার ভিন্নতার ওপর নির্ভর করে গুড়ের ধরন বদলে যায়। রস জ্বালাতে জ্বালাতে যখন রঙ আসে, তখন চুলার জ্বাল কমিয়ে প্রথমে তৈরি হয় রাব / লিকুইড দানা ছাড়া গুড়। এই গুড় আরও ৫–৬ মিনিট জ্বালালে হয় দানা গুড়। আর দানা গুড়কে আরও কিছু সময় দক্ষ হাতে জ্বাল ও চটকানোর মাধ্যমে তৈরি হয় চকলেট / বীজ গুড়। চকলেট / বীজ গুড় তৈরির জন্য বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন। এটি পাটালির তুলনায় কিছুটা নরম এবং চকলেটের মতো ঘ্রাণযুক্ত। অন্যদিকে পাটালি গুড় তুলনামূলক শক্ত এবং হালকা তেঁতো ভাব থাকতে পারে – যা সাধারণত জিহ্বায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না।
গড়ে ৮–১০ লিটার রস থেকে ১ কেজি গুড় তৈরি হয়। এই পরিমাণ রস কাঁচা বিক্রি করলে যেখানে ১০০০–১৫০০ টাকা আয় সম্ভব, সেখানে আমরা স্বাদ ও গুণমানকে প্রাধান্য দিয়ে গুড় তৈরি করি। প্রতিদিন ভোর ৫টায় রস সংগ্রহ করে সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত লাকড়ির চুলায় গুড় জ্বালানো হয়। এভাবে মাসে গড়ে ২২ দিন রস সংগ্রহ করা যায় এবং গাছের সুস্থতার জন্য বাকি দিনগুলোতে গাছকে বিশ্রাম দেওয়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরাসরি রস ও গুড় উৎপাদনে এবং অন্যান্য প্রয়োজন মিলিয়ে ৫ জন জনবল কাজ করেন। এভাবেই সকলের অক্লান্ত শ্রম ও প্রচেষ্টার ফল গ্রাসরুট ইনিশিয়েটিভের খাঁটি খেজুরের গুড়।
সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি পণ্য নয় – এটি একটি শ্রমনির্ভর, দায়িত্বশীল এবং সততাভিত্তিক উদ্যোগ।
